রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ন

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়
Reporter Name / ১০৩ Time View
Update : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬

মাঘের শুরুতেই নীলফামারীর ডিমলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদ যেন রূপ নিয়েছে হলুদ এক প্রাকৃতিক ক্যানভাসে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুটে থাকা সরিষা ফুল বিকেলের নরম আলোয় আরও উজ্জ্বল ও মোহনীয় হয়ে ওঠে। দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই দৃশ্য চোখে পড়লেই থমকে দাঁড়াতে হয়। প্রকৃতির এমন অপূর্ব সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন।

ডিমলা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের জমিতে এবার সরিষার ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় কৃষকেরা আশাবাদী। তবে একদিকে টানা শৈত্যপ্রবাহ, অন্যদিকে দর্শনার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।

খালিশা চাপানি ইউনিয়নের বাঘেরপুল এলাকা, যা স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যানপাড়া নামে পরিচিত, সেখানে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ জন কৃষক এই আবাদে যুক্ত। কৃষকদের মতে, সরিষা চাষে খরচ কম, সেচের প্রয়োজন কম এবং শ্রমও তুলনামূলকভাবে কম লাগে। সময়মতো আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই ফসল কৃষকদের বাড়তি আয়ের বড় ভরসা হয়ে ওঠে। এবারও ফলনের সম্ভাবনা ভালো হলেও টানা কয়েক দিনের শীতে কিছু ফুল ঝরে পড়েছে।

এলাকাটির পাশ দিয়ে তিস্তা নদীর প্রধান খাল এবং কাঁকড়া বাজার আঞ্চলিক সড়ক চলে যাওয়ায় সরিষাখেতের সৌন্দর্য সহজেই নজরে আসে। সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে হলুদ ফুলের সমারোহ দেখে থামছেন পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীরা। মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ নানা যানবাহনে করে দর্শনার্থীরা এসে ভিড় করছেন। কেউ সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার খেতের ভেতরে ঢুকে সেলফি ও ভিডিও ধারণ করছেন, যা ফসলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

তিস্তা ব্যারেজে ঘুরতে এসে সরিষাখেত দেখতে আসেন রংপুরের পাগলাপীর এলাকার তুহিন ও সবুজ। তুহিন বলেন, “অনেকের কাছে শুনে এখানে এসেছি। সামনে এসে মনে হলো, যেন হঠাৎ রঙিন এক স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। চারপাশের হলুদ রং মনটা শান্ত করে দেয়।”

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে বিপাকে পড়ছেন কৃষকেরা। চেয়ারম্যানপাড়া এলাকায় পাঁচ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করা কৃষক আজগর আলী বলেন, বর্ষা মৌসুমে এই জমি বিলের মতো পানিতে ডুবে থাকে। তিস্তা নদীর প্রধান খাল খননের ফলে শুষ্ক মৌসুমে স্বল্প খরচে আমন ধান চাষ করা সম্ভব হয়েছে। অতিরিক্ত ফসল হিসেবে সময়মতো সরিষার আবাদ করা হয়। প্রতিবছর ফলন ভালো হলেও এবার শীতের কারণে কিছু ফুল নষ্ট হয়েছে। তার ওপর প্রতিদিন দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত দর্শনার্থী খেতে ঢোকায় গাছ ভেঙে যাচ্ছে এবং ফুল নষ্ট হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ডিমলার ১০টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাস্তবে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত না হলেও গত বছরের তুলনায় সরিষার আবাদ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, একটানা শৈত্যপ্রবাহের কারণে কোথাও কোথাও গাছের বৃদ্ধি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। কিছু এলাকায় রোগ ও পোকার আক্রমণের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফসল কাটার পর প্রকৃত ফলন নির্ধারণ করা যাবে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দর্শনার্থীদের সরিষাখেতে প্রবেশ না করে সড়কের পাশ থেকেই সৌন্দর্য উপভোগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কৃষকদের ফসল রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।

এদিকে গয়াবাড়ি ইউনিয়নের ফুটানির হাট এলাকায় বিস্তীর্ণ সরিষাখেতে মৌবক্স স্থাপন করে মধু আহরণ করা হচ্ছে। এতে একদিকে খাঁটি মধু উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষার ফলন বৃদ্ধিতেও সহায়তা মিলছে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি কৃষকের ফসল রক্ষায় দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Popular Post
Last Update